দীর্ঘ ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সিটি স্ক্যান মেশিন। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন দূর-দূরন্ত থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা। অনেক বেশি টাকা দিয়ে তাদেরকে বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতাল থেকে সিটি স্ক্যান করাতে হচ্ছে। এতে করে চিকিৎসা সেবার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে সাধারণ দরিদ্র রোগীদের। টাকার অভাবে ব্রেইন বা অন্যান্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেকে।
আশির্ধ্ব বৃদ্ধা ফতেমা বেগম কয়েক বছর ধরে বুকের সমস্যায় রোগে ভুগছেন। কয়েকদিন আগে তিনি পৌত্রকে সঙ্গে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের আউটডোরে গেলে চিকিৎসক তাকে সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দেন। বৃদ্ধার পৌত্র ইকবাল হোসেন জানতেন হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করানো যায়। কিন্তু পরীক্ষার জন্য হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে গিয়ে জানতে পারেন, হাসপাতালের একমাত্র সিটি স্ক্যান মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
বৃদ্ধার পৌত্র ইকবাল হোসেন বলেন, “দাদির চিকিৎসার জন্য আশাশুনি উপজেলা থেকে এসেছি। গ্রামে একটা ছোট চিংড়ি ঘেরের আয় দিয়ে তাদের সংসার চালাতে হয়। দাদিকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করানোর সামর্থ্য আমার নেই।”
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে হাসপাতালের একমাত্র সিটি স্ক্যান মেশিনটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ফাতেমা বেগমের মতো অনেক দরিদ্র রোগী সাতক্ষীরা হাসপাতালে সিটি স্ক্যান সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে অর্থের অভাবে সাধারণ দরিদ্র রোগীরা পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা। বিগত ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে এই পরিষেবা বন্ধ রয়েছে বলেও জানা যায়।
সূত্রে আরও যায়, সদর হাসপাতালে সিটি স্ক্যান পরিষেবা পেতে পরীক্ষার ধরন অনুযায়ী ২ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ হয়, অন্যদিকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তার জন্য খরচ হয় ৪ হাজার ও ৬ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সাবেক সিভিল সার্জন সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডাঃ এস, জেড আতিক বলেন, “২০১২ সালে সিটি স্ক্যান পরিষেবাটি সদর হাসপাতালে প্রথম শুরু হয়। টানা ৮ বছর চলার পর ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মেশিনটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেই থেকে অদ্যাবধি হাসপাতালে পরিষেবাটি বন্ধ রয়েছে বলে আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর হাসপাতালের একজন স্টাফ জানান, “ডাঃ তৌহিদুর রহামন সিভিল সার্জন থাকা কালিন সময়ে সিটি স্ক্যানিং মেশিনটি একবর নষ্ট হয়ে যায়। সেসময় মেরামতের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে ৯৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অল্প কিছু টাকা খরচ করে মেশিনটি কোনো রকম ঠিক করা হয়। কিছুদিন চলার পর ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরে সেটি আবার নষ্ট হয়ে যায়। সেই থেকে দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে মেশিনটি এখন একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে।” অদক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে সিটি স্ক্যান মেশিনটি অপারেট করার কারণে দ্রুত সেটি নষ্ট হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সদর হাসপাতালের সাবেক টেকনিশিয়ান মোঃ জাকির হোসেন বলেন, “সিটি স্ক্যান মেশিনটি কেনার পর টানা ৭/৮ বছর সার্ভিস দিয়েছে। একপর্যায় সেটি নষ্ট হলে মেরামত করে কিছুদিন চালানোর পর হঠাৎ আর স্ক্যান নিচ্ছিল না। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর কয়েকজন সিভিল সার্জন দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু কেউ সিটি স্ক্যান মেশিনটি মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।”
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ আব্দুস সালাম জানান, “আমি এখানে যোগদানের পর জানতে পারি, এখন থেকে ৪/৫ বছর আগে হাসপাতালের সিটি স্ক্যান মেশিনটি নষ্ঠ হয়ে গেছে। আমরা নতুন একটি মেশিন কেনার জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। একটি নতুন মেশিনের দাম প্রায় ১২/১৩ কোটি টাকা। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। হয়তো দ্রুত আমরা একটি নতুন সিটি স্ক্যান মেশিন পেয়ে যাবো।”
খুলনা গেজেট/এনএম



